নিজস্ব প্রতিবেদক: জলবায়ু কর্মী ও বক্তারা বলেছেন, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জলবায়ু বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি। তারা বলেন, প্রতি বছর জিডিপি বাড়লেও জলবায়ু খাতে বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়েনি, ফলে আগের মতোই গতানুগতিক ধারা অব্যাহত রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে জলবায়ু খাতে ব্যয় জিডিপির মাত্র ০.৭৬ শতাংশ, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তারা জলবায়ু অর্থায়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে বরাদ্দ অন্তত জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা উপকূলীয় পানি ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক অভিযোজন পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়ে বলেন, পানি ব্যবস্থাপনায় ২টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে প্রথমত, উপকূলীয় সুরক্ষায় অবকাঠামো উন্নয়ন তারমধ্যে, বেড়িবাঁধ, স্লুইস গেট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য পানি অবকাঠামোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি পুরোনো পোল্ডার ও বাঁধ সংস্কার এবং জলবায়ু-সহনশীল উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ, দ্বীতিয়ত, নিরাপদ পানি ও সেচ ব্যবস্থা উন্নত করতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুকুর খনন, মুক্ত জলাশয় ও খাল পুনরুদ্ধার, পানি-সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন করা, সেজন্য বাজেটে অগ্রাধিকারভাবে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। তারা আরও বলেন, বিশেষ করে কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে গভীর নলকূপ স্থাপনে কঠোর নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, যাতে ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষা করা যায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গভীর নলকূপ স্থাপনে অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া সেখানে পানীয় জলের জন্য নাফ নদীর পানি শোধন করে সরবরাহ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আজ ১৪ জুন ২০২৬ ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে কোস্ট ফাউন্ডেশন, বিডিসিএসও প্রসেস ও ইক্যুইটিবিডি’র যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত “জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭ ও জলবায়ু বরাদ্দ: উপকূলীয় সুরক্ষার অগ্রাধিকার কতটা?” শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ সকল দাবিসমূহ তুলে ধরেন। কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জনাব এম রেজাউল করিম চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জনাব মোঃ জিয়াউল হক, এসডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক, জনাব সামছুল হক, ক্ষুদ্রঋণ নীতি ও অ্যাডভোকেসি বিশেষজ্ঞ জনাব মোঃ মোশারফ হোসেন, আরডিআরএস-বাংলাদেশ এর পরিচালক জনাব তারেক সাইদ হারুন, পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম এর সাধারন সম্পাদক জনাব মো: মোতাহার হোসেন, কোস্ট ফাউন্ডেশন এর পরিচালক সৈয়দ আমিনুল হক, ইক্যুইটিবিডি’র ওমরক ফারুখ ভূইয়া, বিডিসিএসও প্রসেস-এর ইকবাল উদ্দিন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর জনাব মোঃ আহসানুল ওয়াহেদ, দৈনিক প্রথম আলোর ভোলা-জেলার প্রতিনিধি জনাব নেয়মত উল্ল্যাহ, দশমিনা সাংবাদিক সমিতির সভাপতি, রায়হান বাদল প্রমূখ।সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান জনাব এম.এ. হাসান ।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এম. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছেন, উপকূলীয় জনগণের জন্য জলবায়ু ন্যায্যতা অবশ্যই জাতীয় বাজেটে প্রতিফলিত হতে হবে। তিনি লবণাক্ততা, নদীভাঙন, পানি সংকট ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতিকে জীবিকার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বচ্ছ জলবায়ু অর্থায়নের আহ্বান জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক দুটি প্রধান অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, পানি-সম্পর্কিত দুর্যোগ ও পানিবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষা। দ্বিতীয়ত, কৃষি ও পানীয় জলের জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, তীব্র পানীয় জলের সংকট মোকাবিলায় সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণ, পুকুর খনন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার বাড়াতে হবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, এসব উদ্যোগ শিখে নিরাপদভাবে এবং ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
মো. মোশাররফ হোসেন, মাইক্রোফাইন্যান্স পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি বিশেষজ্ঞ, বলেছেন বাজেট ঘাটতি কমাতে ভালো শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার। তিনি জবাবদিহিতা বাড়ানো, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সংস্কারের ওপর জোর দেন, যাতে অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ হয়।
আরডিআরএস বাংলাদেশের পরিচালক তারিক সাঈদ হারুন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) জিডিপিতে প্রায় ২২ শতাংশ অবদান রাখলেও এখনো যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। তিনি এ খাতকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক উল্লেখ করে সরকারের স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়ন সহায়তার আহ্বান জানান। সৈয়দ আমিনুল হক জাতীয় বাজেটে এমএফআইগুলোর জন্য আলাদা অর্থায়ন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান। তিনি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণে নীতি প্রণয়ন এবং সিআইবি (CIB) ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।



