নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপি সরকার গঠনের পর বিভিন্ন খাতে সংস্কারের কাজ শুরু করে দিয়েছে। তাই আগামী মাস থেকে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের আমূল পরিবর্তন আসছে বলে জানান বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্টরা। আগামী মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকেরর এমডিদের অপসারণ করে নতুন এমডি দেয়া হতে পারে। সেখানে সাবেক ও বর্তমান ডিএমডিদের মূল্যায়ন করা হতে পারে। এছাড়া নতুন করে সাজানো হবে সকল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মানুষ আশা করেছিল দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনেক উন্নতি হবে। আর্থিকখাতে বড় পরিবর্তনের আশা করছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই আশা মোটেও পূরণ করতে পারেনি অন্তর্বর্তীকালিন সরকার। বরং উল্টো আর্থিকখাতের অবস্থা আরো ভয়াবহ পরিনত হয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সর্বনিম্ন এসে পৌঁছিয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, বর্তমানে ব্যাংকখাতে লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে সরকারকে কার্যকর ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এমন নীতি দরকার, যা অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করবে এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের পর অর্থনীতি সচল করতে সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়াই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
জানা গেছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সুশাসনের মধ্যে আনতে কাজ করবে নতুন সরকার। খারাপ ব্যাংকগুলো নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করবে বিএনপি সরকার। নতুন করে কোন ব্যাংক মার্জ হবে কিনা জানা যাবে ঈদের পর। অর্থমন্ত্রনালয়ে সবদিক বিবেচনা নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে সংশ্লিষ্টরদের কাছ থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো ও বিনিয়োগে আস্থা ফেরানোর মতো কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠন এখন বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শক্তিশালী আইনি কাঠামো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো ও সুশাসন নিশ্চিত করা- এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য আর্থিকব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই কেবল বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ও দেশের অর্থনীতি টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে কিনা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে দেশের শিল্পখাতে বিনিয়োগ অনেকাংশে কমেছে। শুধু যে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে তা নয়, আস্থার সংকটে দেশীয় বিনিয়োগও নেমেছে প্রায় তলানিতে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চান শিল্পমালিকরা। ‘মন্দার’ অর্থনীতিতে ফেরাতে চান চাঙ্গা ভাব। এজন্য নতুন সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তারা।
দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও প্রাইভেট সেক্টরের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং খাতের তারল্য উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)।
অর্থনীতির গতি ফেরাতে ব্যবসায়ীরা নতুন সরকারের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার নিশ্চয়তা চান বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে। অর্থের হিসাবে যা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। একই সংকট বিরাজ করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও।
বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, ‘বর্তমানে পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তাই স্বল্পমেয়াদি হলেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর সমাধান দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শিল্পখাত আরও দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব।’
ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারকেও বড় প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে ফয়সাল সামাদ বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা শিল্পের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদের হার কমানো গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন।’ একদিকে তহবিল তথা ফান্ড সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, অন্যদিকে এলসি ওপেনিং নিয়ে জটিলতা। নানা অজুহাতে এলসি খুলতে বিলম্ব করা হচ্ছে।
ফলে যথাসময়ে আমদানি করতে বিলম্ব হচ্ছে। আগের সরকারের সময় আমরা দেখেছি কীভাবে ব্যাংকগুলো লুটপাট হয়েছে এবং কীভাবে ব্যাংকের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। এখন দেখছি, ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের টাকাই আটকে রেখে বা নানা জটিলতার মাধ্যমে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা অসহায়ভাবে সবকিছু দেখছি, কিন্তু কার্যকরভাবে কিছু করতে পারছি না। সুতরাং, নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, ব্যবসায়ীদের এই সংকট থেকে উদ্ধার করা এবং ব্যাংকখাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা।



