অর্থনৈতিক প্রতিবেদক: বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের (বিসিবি) পর্ষদকে ‘মব’ সৃৃষ্টি করে পদোন্নতি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এই সিন্ডিকেট বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ভয়ভীতি, কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করার অভিযোগ তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
ব্যাংকের সূত্র জানায় গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন পর্ষদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন পর্ষদ ব্যাংকটিকে আগের অবস্থান থেকে তুলে ধরতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে আগের তুলনায় অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকটি। আমানত ও আদায় বেড়েছে অনেকটাই। তাই ব্যাংকটিকে ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, সেই জন্য কাজ করছে একটি চক্র। সংঘবদ্ধ একটি চক্র ব্যাংটির সুনাম নষ্ট করতে চাকরি বাণিজ্য, পদোন্নতি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং বেতন-ভাতা বাড়ানোর নামে ‘মব’ সৃষ্টি করে পরিবেশ নষ্ট করতে পায়তারা করছে। এতে ব্যাংকের স্বাভাবিক অফিসিয়াল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা, নিরীহ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, এই চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ড্রাইভার আইয়ুব। আইয়ুব ব্যাংকের জায়গা দখল করে স্টেশনারি ও বিকাশের দোকান খুলেছেন। তার সাথে যুক্ত রয়েছেন, সাভার শাখার ম্যানেজার রাজি, এস্টাবলিশমেন্টের সবুজ, ক্রেডিটের শারাফাত, ট্রেড ডিভিশনের হেড জামাল উদ্দিন ও প্রশান্ত রায়। এছাড়া ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার সুমি ও বিপুল কুমার কুন্ড এবং এইচআর প্রধান রেজাউল, ট্রেজারার রফিক, সুইফট বিভাগের হান্নান, প্রদান শাখার জাহানারা, অডিট বিভাগের তাপস, ক্রেডিট বিভাগের আরিফ, মঈন, সঞ্জয় ও তানিয়া।
অভিযোগের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিরাপত্তাহীনতায় ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্যাংকের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বচ্ছতা সংকটে পড়বে, এমন আশঙ্কা কর্মকর্তাদের। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ভেতরে সিন্ডিকেটের দাপট এবং ক্ষমতার অব্যবস্থাপনা শুধু ব্যাংকের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে না, একই সঙ্গে সরকারি তহবিল ও সাধারণ মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে জানান তারা।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাডভাইজরি ও অডিট বিভাগের লিখিত আপত্তি থাকা সত্ত্বেও চাপ প্রয়োগ করে ৩১৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ঘেরাও করে এসব সিদ্ধান্ত আদায় করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষাগত ও পেশাগতভাবে অযোগ্য। কেউ শুধু ইন্টারমিডিয়েট পাস, আবার কেউ আগে শাস্তিপ্রাপ্তও ছিলেন।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল থাকা সত্ত্বেও গত ডিসেম্বর মাসে বেতন ও এগ্রিমেন্ট প্রফিট বাবদ প্রায় ৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে অভিযোগ আছে, এসব অর্থ ছাড়ের পেছনে ঘুষ ও সুবিধা লেনদেন রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, গালাগালি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। হেড অফিসে বহিরাগতদের নিয়ে প্রবেশ, গণ্ডগোল ও অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে।
এ পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্যাংকের পক্ষে গতকাল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বাধ্য হয়েছেন।
জিডির ভাষ্য অনুযায়ী, বদলি আদেশ জারির পর দিন ১৯ জানুয়ারি বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে বদলি আদেশপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। এ সময় তারা উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নাম ধরে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ড্রাইভার আইয়ুব ও তার সহযোগীরা ‘বিসিবি কর্মচারী ইউনিয়ন’ নামের একটি সংগঠন গড়ে ব্যাংকের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ছাড়া ব্যাংকের তরঙ্গ কমপ্লেক্সে অবৈধভাবে জায়গা দখল করে আর্থিক লেনদেনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক কিছু ইজেড (ঊত) প্রতিষ্ঠানে অর্থ প্রদানের ঘটনায় শাস্তির সুপারিশ থাকলেও নথি গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কমার্স ব্যাংকের ইসি কমিটির চেয়ারম্যান মো. মহসিন মিয়া বলেন, বদলির আদেশ কোনো অনিয়ম নয়। এটি যেকোনো ব্যাংক বা শাখাবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া। সব ব্যাংকেই স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের বদলি হয়ে থাকে। গত ১৮ তারিখে ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) যৌথভাবে মোট ১০ জন কর্মকর্তাকে বদলি করেন। এই বদলিগুলোর মধ্যে হেড অফিস থেকে শাখায় এবং শাখা থেকে হেড অফিসে—এভাবে পাঁচটি ট্রান্সফার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে বদলির আদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। ওই সময় এমডি অফিসে উপস্থিত ছিলেন না। পরে তারা ডিএমডিকে অবরুদ্ধ করে চাপ প্রয়োগ করেন এবং হুমকির মুখে ডিএমডির কাছ থেকে বদলির আদেশ ‘ক্যান্সেল’ বা প্রত্যাহার সংক্রান্ত একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেন।
মো. মহসিন মিয়া বলেন, মূল বিষয় হলো, বদলির আদেশটি এমডি ও ডিএমডি দু’জনের যৌথ স্বাক্ষরে জারি হয়েছিল, অথচ সেই আদেশ প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কেবল একজনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, তাও চাপ ও হুমকির মাধ্যমে। বিষয়টি সম্পূর্ণ বেআইনি। ডিএমডি ইতিমধ্যে মতিঝিল থানায় একটি জিডি করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ডিএমডির নাম জহিরুল আলম। তার জিডির কপিও সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছেছে।
ব্যাংকের ইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের বেশি একজন কর্মকর্তাকে একই জায়গায় রাখা যায় না। ব্যাংকের স্বার্থেই এসব নিয়ম মানা হয়। এখানে কোনো অবৈধ কাজ করা হয়নি।



