নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারবিরোধী তৎপরতায় ৪০৪ শিক্ষক জড়িত—এমন শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মনগড়া ও তথ্যগত ভুলে পরিপূর্ণ’ বলে দাবি করেছে পাবলিক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, প্রকাশিত তালিকা ও প্রতিবেদনের তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগেরও সমালোচনা করেছে সংগঠনটি।
আজ বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে পাবলিক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান স্বাক্ষর করেন। তারা দেশের সব গণমাধ্যম ও প্রিন্ট মিডিয়ার কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রতিবাদলিপিটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশের আহ্বান জানান।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, এশিয়া পোস্টসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকাশিত তালিকাটি অত্যন্ত এলোমেলো, অপরিকল্পিত, ভুলে পরিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ মনগড়া। বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই জোড়াতালি দিয়ে এবং একটি পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সংগঠনটির দাবি। তাদের ভাষ্য, ইচ্ছাকৃতভাবে ও ত্রুটিপূর্ণভাবে তথ্য উপস্থাপনের কারণে প্রতিবেদনে অসংখ্য গুরুতর তথ্যগত ভুল রয়েছে।
সংগঠনটি প্রতিবাদলিপিতে একটি নির্দিষ্ট উদাহরণও তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়, একটি কলেজের অধ্যক্ষকে কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হতে পারে—এমন প্রশ্নই প্রকাশিত তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি করে। প্রতিবাদলিপিতে দাবি করা হয়, প্রকাশিত স্ক্রিনশটগুলোই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তালিকাটি অত্যন্ত অসতর্কতার সঙ্গে এবং ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে পুরো প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পাবলিক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের দাবি, প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষক সমাজকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা এবং তাদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা। সংগঠনটির ভাষ্য, এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের ফলে শিক্ষকদের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের পরিবেশও বিঘ্নিত হতে পারে।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে এ কারণে যে, প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের সত্যতা যাচাই কিংবা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা না করেই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। সংগঠনটির মতে, একটি অবিশ্বস্ত ও মনগড়া প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে তদন্ত কমিটি গঠন করা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পাবলিক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ভাষ্য, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া এ ধরনের তদন্ত কমিটি গঠনের কোনো নৈতিক বা আইনগত ভিত্তি নেই। সংগঠনটি মনে করে, একটি ভিত্তিহীন প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তাদের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচারের নীতি এবং আইনি সুরক্ষার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘সরকারবিরোধী তৎপরতায় ৪০৪ শিক্ষক’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান বা তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে পাবলিক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের দাবি, যেসব তথ্যের ভিত্তিতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। তাই কোনো প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
সংগঠনটি বলেছে, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অন্যতম শর্ত হলো তথ্য প্রকাশের আগে নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই করা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সেই ন্যূনতম মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলে তারা মনে করে। ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে এবং শিক্ষক সমাজকে অযথা বিতর্কের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবাদলিপির শেষাংশে সভাপতি ড. এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং সাধারণ সম্পাদক ড. মাহবুবর রহমান সংশ্লিষ্ট সব গণমাধ্যমের প্রতি তাদের প্রতিবাদ যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে তথ্যের সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং শিক্ষকদের সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখার স্বার্থে যাচাই-বাছাইবিহীন তথ্যের ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয়।



