অর্থনৈতিক প্রতিবেদক: শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ। ২০০৩ সালে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এএমডি পদে দায়িত্ব পালনের আগে তিনি একই ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যাংক খাতে করপোরেট ব্যাংকিং, রফতানি অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ প্রশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষা, মানবসম্পদ, ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা এবং শাখা ব্যাংকিংয়ে তার রয়েছে ব্যাপক অভিজ্ঞতা। এছাড়া আগামীর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পরবর্তী সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছেন তিনি। যা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো…
প্রশ্ন: এ বছরের শেষ দিকে গিয়ে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পৌঁছাতে পারে। আগামী নভেম্বর মাসে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, এলডিসি উত্তরণ যেন তিন থেকে ছয় বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় সরকার। বিষয়টিকে আপনি আপনি কীভাবে দেখছেন?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। এটি দেশের আয়, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার উন্নতির প্রতিফলন। তবে এটি শুধু সম্মানজনক একটি মাইলফলক নয়, বরং একটি ট্রানজিশন পয়েন্টও, বিশেষ করে রপ্তানি নির্ভর গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের জন্য। এই উত্তরণ স্বল্পমেয়াদে কিছু কাঠামোগত চাপ তৈরি করবে, যার জন্য আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন : গার্মেন্টস শিল্পের জন্য এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: বর্তমানে এলডিসি সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও জাপানের মতো প্রধান বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করেছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রধান ঝুঁকি হলো শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা হারানো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় বাজারে ৮–১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হলে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যের মূল্য বাড়বে এবং অর্ডার প্রবাহ ও বাজার অংশীদারিত্বে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এলডিসি পরবর্তী বাংলাদেশ কতটা চাপে পড়তে পারে?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন এফটিএ (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট) ও পিটিএ (প্রিফারেন্সিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট) সুবিধা ভোগ করছে, তারা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে যাবে। ফলে শুল্ক আরোপের পর বাংলাদেশের মূল্যভিত্তিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে স্বল্পমূল্যের বাল্ক উৎপাদনে। তাই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রাধান্য বজায় রাখতে অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবসায়িক চুক্তি, বৈচিত্র্যমূলক রপ্তানি পণ্য এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ জরুরি। সময়মতো কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই চাপকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
প্রশ্ন: এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রভাব ব্যাংকিং খাতে কীভাবে পড়তে পারে?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: শিল্পে চাপ তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব ব্যাংকিং খাতে পড়ে। গার্মেন্টস শিল্পে শুল্ক, মূল্যছাড়ের চাপ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মুনাফা কমতে পারে, যা কারখানার ক্যাশ ফ্লো দুর্বল করবে। এর সরাসরি প্রভাব ব্যাংকিং খাতে পড়বে, যেখানে রপ্তানি নির্ভর বিনিয়োগে ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং খেলাপি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক অর্থায়ন, ক্রেডিট মনিটরিং এবং শিল্প বিশেষায়িত সমাধান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং প্রভাবশালীন নীতি গ্রহণ এই চাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হবে।
প্রশ্ন: এমন বাস্তবতায় ব্যাংকগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ কী হবে? কী ধরনের উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন হবে?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ঝুঁকি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। একদিকে শিল্পকে সহায়তা করতে হবে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। দুর্বল ক্যাশ ফ্লো ও অর্ডার অনিশ্চয়তা ব্যাংকের ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্টক ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই কৌশলগত ঝুঁকি মূল্যায়ন, শিল্পভিত্তিক মনিটরিং এখন আগের চেয়ে বেশি জরুরি। ব্যাংকগুলোর উচিত ঝুঁকিভিত্তিক অর্থায়ন জোরদার করা, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, রপ্তানি বিল ডিসকাউন্টিং এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অর্থায়নে গুরুত্ব দেওয়া। একই সঙ্গে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও প্রযুক্তি আপগ্রেডে লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন প্রয়োজন। গ্র্যাজুয়েশনের পর শিল্পে দীর্ঘ লিড টাইম ও উচ্চ ইনভেন্টরি চাহিদা থাকতে পারে, তাই ব্যাংকগুলোর বাস্তবসম্মত ক্যাশ ফ্লো প্রজেকশন এবং নমনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল কাঠামো গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের কৌশলগত উদ্যোগ শিল্পকে সহায়তা করবে এবং ব্যাংকের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখবে।
প্রশ্ন: এলডিসি পরবর্তী বাস্তবতায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রস্তুতি কী?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: আমরা বিষয়টিকে কেবল একটি ঝুঁকি হিসেবে নয়, বরং কাঠামোগত রূপান্তরের সুযোগ হিসেবেও দেখছি। এলডিসি পরবর্তী বাস্তবতায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক একটি স্থিতিস্থাপক, প্রযুক্তিনির্ভর গ্লোবালি কম্প্রায়েন্ট ইসলামিক ব্যাংক। ব্যাংকটি ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ও ডেটা ভিত্তিক সিদ্ধান্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং রপ্তানি, ট্রেড ফাইন্যান্স ও বাজারভিওিক ইসলামী পণ্য উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদারে মনোযোগ দিচ্ছে। পরিবর্তিত রপ্তানি খাতে অর্থায়নের পাশাপাশি আমরা মনিটরিং, কমপ্লায়েন্স ও ব্যবসার টেকসই সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা কম্পায়েন্স ফ্রেমওয়ার্ক শক্তিশালী করা, রিস্ক সুপারভিশন ইন্টারনাল কন্ট্রোল জোরদার করা, এএমএল/সিএফটি রেগুলেটরি কম্পায়েন্স আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার চেষ্টা করছি, যাতে খউঈ পরবর্তী কঠোরতর রেগুলেটরি পরিবেশ মোকাবিলা করা যায়। পাশাপাশি সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সিংকে মূলধারায় আনা, এসএমই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইসলামী ফাইন্যান্স সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলাই ব্যাংকের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংক গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল রেটিং এ সেরা টেকসই ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যা তার কৌশলগত প্রস্তুতির প্রমাণ।
প্রশ্ন: নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা হওয়া উচিত এমনভাবে যে তারা ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের শক্তিশালী তদারকি এবং শিল্প খাতের সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংককে ট্রানজিশন পিরিয়ডে রি-ফাইন্যান্স স্কিম সম্প্রসারণ, রপ্তানি নির্ভর শিল্পের জন্য বিশেষ ক্রেডিট গাইডলাইন প্রণয়ন এবং ব্যাংক ও শিল্প উভয়ের ঝুঁকি সামলাতে নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রিস্ক সুপারভিশন জোরদার করা এবং ক্রেডিট ও তারল্য প্রবাহ অব্যাহত রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
প্রশ্ন: এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন কি নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: অবশ্যই। এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ক্রেডিট প্রোফাইল উন্নত হবে, যা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট এবং প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে উন্নত গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছতা, ঊঝএ কমপ্লায়েন্স ও বাজারভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রগতির কারণে প্রযুক্তি, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি ও ভ্যালু-অ্যাডেড ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রশ্ন: গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যৎ কৌশল কী হওয়া উচিত?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী বাস্তবতায় গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যৎ কৌশল হওয়া উচিত ‘কস্ট ড্রাইভেন মডেল’ থেকে বের হয়ে একটি ‘ভ্যালু ড্রাইভেন, ডাইভার্সিফাইড সাসটেইনেবল গ্রোথ মডেলে’ রূপান্তর করা। এজন্য শিল্পকে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ ও উচ্চ মূল্য সংযোজিত পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও নিজস্ব ব্র্যান্ড উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, একই সঙ্গে অটোমেশন, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ঊঝএ, গ্রিন ফ্যাক্টরি ও কমপ্লায়েন্সে নেতৃত্ব, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন ও লজিস্টিক্স দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। এভাবে গার্মেন্টস শিল্প এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে রপ্তানি খাতে ব্যাংকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: ব্যাংককে কেবল অর্থদাতা নয়, বরং ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। মনিটরিং, পরামর্শ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে রপ্তানি শিল্পের পাশে দাঁড়াতে হবে।
প্রশ্ন: এলডিসি পরবর্তী সফল হতে হলে কী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: এলডিসি পরবর্তী বাস্তবতায় সফল হতে হলে শিল্প, সরকার ও ব্যাংকিং খাতের সমন্বিত উদ্যোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, ট্যারিফ ও রপ্তানি নীতি, এবং ঝুঁকিভিত্তিক, কাস্টমাইজড অর্থায়নের সমন্বয় ছাড়া টেকসই প্রতিযোগিতা ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। এ ধরনের সমন্বিত কৌশলই দেশের এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী অবস্থান নিশ্চিত করবে।



