ডেস্ক: হাটহাজারীর দুর্ঘটনা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ভয়ঙ্কর বিপদ সংকেত। সেখানে প্রশিক্ষণ চলাকালে চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ ট্যাঙ্ক থেকে গোলাবর্ষণের সময় দুই জওয়ান প্রাণ হারান। গুরুতর জখম হন এক সেনা কর্মকর্তা।
এই দুর্ঘটনার জেরে ফের চীনা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বিরোধিতা করেছেন চীনের তৈরি যুদ্ধ বিমান জে-১০সি কেনার সরকারি সিদ্ধান্তেরও। একই সঙ্গে চীনা প্রযুক্তিতে পাকিস্তানে তৈরি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক ৩’ যুদ্ধবিমান কেনারও তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ডফায়ারিং রেঞ্জে সেনাবাহিনীর ফিল্ডফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। জানা গিয়েছে একটি টাইপ ৫৯ ট্যাঙ্ক থেকে গোলা বর্ষণের সময় দুই সেনা সদস্য নিহত হন। তারা হলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের তাসনিম রিফাত এবং নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সুনদলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুর সিদ্দিক পিয়াস।
দুর্ঘটনার সময় এক জন ছিলেন ট্যাঙ্কের মধ্যে এবং অন্য জন ছিলেন ট্যাঙ্কের প্রবেশ পথে। বিস্ফোরণে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় তাদের দেহ। গুরুতর জখম হন ক্যাপ্টেন মঈনুদ্দিন। ট্যাঙ্কের ফায়ারিং অনুশীলনের সময় কী কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে চীনের তৈরি এই ট্যাঙ্ক গঠন ও ধারণাগত দিক থেকে অত্যন্ত পুরনো। তাই ট্যাঙ্কে প্রযুক্তিগত কোনও সমস্যা হয়েছিল কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা খেলনার মতোই চীনা অস্ত্রও মোটেই টেকসই নয়। অত্যন্ত নিম্নমানের কারণে গোটা দুনিয়াতেই চীনা অস্ত্রের কদর কমছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে চীনের এক চতুর্থাংশেরও বেশি অস্ত্র রপ্তানি কমেছে। অস্ত্রের ওজনের মানকেই তারা এর জন্য দায়ী করেছে। সুইডেনের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট বা সিপরির প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে চীনের অস্ত্র ব্যবসায় মন্দার কথা। বিভিন্ন দেশ চীন থেকে অস্ত্র কেনা কমিয়ে ফেলায় গত ৫ বছরে তাদের অস্ত্র বিক্রি কমেছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে গত এক দশকে চীন থেকে বাংলাদেশে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থের অস্ত্র ক্রয় করেছে। চীনের অস্ত্র নিয়ে সামরিক কর্মকর্তাদের আপত্তি থাকলেও পূর্বতন সরকার সেই আপত্তিকে গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমান সরকারও চীনা অস্ত্রের ওপরই ভরসা রাখছেন। তাই দুর্ঘটনার বছর বেড়েই চলেছে বলে অনেকে মনে করেন। চীনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী সংস্থার নাম নরিনকো।
এই নরিনকো বাংলাদেশেও প্রচুর ট্যাঙ্ক, গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেনা সেই সব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে সেনাবাহিনীর ক্ষোভ কিন্তু বহু দিনের। কারণ এগুলির গুণগত মান খুবই খারাপ। তাই সেনাবাহিনীর তরফ থেকে ঢাকায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছে বহুবার আপত্তি জানানো হয়েছে। কোনও কাজ হয়নি। বর্তমান সরকার চীন থেকে আরও অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান কিনতে চাইছে। তাই সেনাকর্তারা অনেকেই মনে করেন, আগামী দিনে বিপদ বাড়ছে সামরিক কর্মীদের।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, চীনের তৈরি যুদ্ধ বিমান জে-১০সি কিনবে বাংলাদেশ। চীনা প্রযুক্তিতে পাকিস্তানের তৈরি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক ৩’ যুদ্ধবিমান কিনতেও আগ্রহী বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহরে পুরোনো ধাঁচের ৩৬ টি চীনের তৈরি এফ-৭ যুদ্ধ বিমান রয়েছে। এই বিমানগুলোর কার্যকারিতা খুবই খারাপ। গত বছর ২১ জুলাই চীনের তৈরি এফ-৭ বিমান ঢাকার উত্তরায় ভেঙ্গে পড়লে পাইলট সহ ২০ জন প্রাণ হারান। গত কয়েক দশকে ৩০ টিরও বেশি চীনা বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।
যান্ত্রিক ক্রুটি এবং ত্রুটি মেরামতিতে চীনা সংস্থার গাফিলতি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সবচেয়ে বড় সমস্যা। ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হিসাবে চীন থেকে কেনা হয়েছে কেডব্লিউ জেট প্লেন, শর্ট রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, মিং শ্রেণীর ডুবোজাহাজ প্রভৃতি। এছাড়াও রয়েছে কামান থেকে শুরু করে প্রচুর পরিমাণে গোলা-বারুদ। কোনও চীনা সরঞ্জামেরই গুণগত মান ভালো নয়।
তাই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিত্যসঙ্গী। শুধু মাত্র কমদামকে বিবেচনায় রেখে চীন থেকে অস্ত্র কেনা এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। ট্যাঙ্কের বিস্ফোরণ সেই প্রশ্নকে আরও শক্তিশালী করেছে। আতঙ্কিত করে তুলছে সেনা সদস্যদের।



