কক্সবাজার প্রতিনিধি: রোহিঙ্গা সংকট নবম বছর শেষ করে দশম বছরে পদার্পণ করেছে। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলো কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে সংকট মোকাবিলায় বরাদ্দকৃত তহবিলের বড় অংশ জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা।
মঙ্গলবার কক্সবাজার প্রেসক্লাবে কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) ও কোস্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করা হয়। ‘রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের তহবিল কোথায় যাচ্ছে?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমে স্থানীয় অংশীজনদের অধিকতর অন্তর্ভুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের মো. শাহিনুর ইসলাম। তিনি জানান, ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (JRP) অনুযায়ী ১৫ দশমিক ৬ লাখ মানুষকে সহায়তা দিতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ৮৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ তহবিল জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে, ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক এনজিও এবং ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ জাতীয় এনজিওর কাছে রয়েছে। তবে JRP-তে অ্যাপিলিং পার্টনার হিসেবে স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য কোনো তহবিল বরাদ্দ নেই।
গবেষণায় আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ আন্তর্জাতিক এনজিও, ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ জাতীয় এনজিও এবং মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ স্থানীয় এনজিও পায়।
শাহিনুর ইসলাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিলের ৯২ শতাংশ পেয়েছে জাতিসংঘের সংস্থা এবং ৮ শতাংশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো। ফলে প্রায় পুরো তহবিলই জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও এর বহুমুখী প্রভাব পড়ছে। কিন্তু ক্যাম্পের আশপাশে বসবাসকারী স্থানীয় জনগণ প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল কবির বলেন, ক্যাম্প এলাকায় বসবাসকারী স্থানীয় মানুষ কোনো ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন না। অথচ আশপাশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন।
রবিউল আলম পরিবেশ সুরক্ষা, ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ এবং কৃষিজমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সিসিএনএফের সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, টেকসই সমাধান ছাড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা কঠিন। সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উখিয়ার ইমাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাফর আলম বলেন, সংকট সমাধানে আসিয়ান, চীনসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
কক্সবাজার সিভিল রাইটস ফোরামের সভাপতি মো. নাছির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রোহিঙ্গা সংকট কক্সবাজারের শিক্ষা খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে তিনি স্থানীয় জনগণের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দাবি জানান।
রোকেয়া ফাউন্ডেশনের আঞ্জুমান আরা বেগম মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিওগুলোর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি মানবিক তহবিলের অন্তত ২৫ শতাংশ সরাসরি স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় এনজিও অগ্রযাত্রার নির্বাহী পরিচালক হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমান JRP ও পুলড ফান্ড ব্যবস্থায় স্থানীয় সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার নেই অথবা অত্যন্ত সীমিত। স্থানীয় সংস্থাগুলোকে JRP-তে অ্যাপিলিং পার্টনার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সরাসরি তহবিলে প্রবেশাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নির্গত বর্জ্যের কারণে স্থানীয় কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী বলেন, স্থানীয় এনজিওগুলোকে তহবিল দেওয়া কোনো দয়া নয়; এটি তাদের অধিকার। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারীও রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর ও টেকসই সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সিসিএনএফের সদস্যরা ছাড়াও বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।



